সৌরভ লোধ ||
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্রতিপক্ষের আক্রমণে গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর বাম হাত ও বাম পা প্রায়ই অচল হওয়ার পথে। মেধাবী ছাত্রটির পরিবার তাঁর লেখাপড়া নিয়েও পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার দক্ষিন শীলমুড়ি ইউনিয়নের পশ্চিম সাইল চোঁ গ্রামের আবু তাহের ও মমতাজ বেগম দম্পতির ছোট ছেলে মাহিন নিরব।
তিনি বর্তমানে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান শাখার অনার্স ১ম বর্ষের ছাত্র।পিতা আবু তাহের এর স্বপ্ন ছিলো ছেলেকে ডাক্তারি পড়াবে।
এসএসসি ও এইচএসসি তে জিপিএ ৫ পেয়ে বাবার স্বপ্নের পিছনেই ছুটছিলেন মাহিন নিরব
দিয়েছিলেন মেডিকেল পরিক্ষাও।কিন্তু অল্পের জন্য বাদ পড়েন সে পরিক্ষা থেকে। তাঁর স্বপ্ন আদৌ পূরণ হবে কিনা– জানেন না মাহিন।

মাহিন নিরব বলেন, আমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত সেনাবাহিনী।এখন আমাদের গ্রামের বাজারে বাবার একটা ছোটখাটো ঔষধ দোকান আছে। বাবার স্বপ্ন ছিলো আমি যেনো একদিন বড় ডাক্তার হতে পারি। সে স্বপ্ন পূরনের জন্য আমিও আমার চেষ্টা অব্যাহত রাখি। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে ভাগ্যের কাছে হেরে যাবো আমি।
আমরা দুই ভাই দুই বোন। বড় দুই বোন অনার্স শেষ করেছে।তারা দুইজন্যই বিবাহিত।বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে চায়না তে। আমি গতবার মেডিকেল ভর্তির জন্য পরিক্ষা দিয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্য খারাপ থাকায় দুই নাম্বারের জন্য ছিঁটকে গিয়েছি। পরবর্তীতে আমার টার্গেট ছিলো দেশের বাহিরে গিয়ে পড়াশোনা করে বড় উদ্যোক্তা হয়ে দেশের জন্য কিছু করবো। বিদেশে পড়ানোর জন্য বাবার জমানো কিছু টাকা ছিলো। এখন সে টাকা দিয়ে চিকিৎসা হতে হয়েছে৷
আমি সবসময় চেয়েছি দেশের জন্য কাজ করতে।তারই ধারাবাহিকতায় দেশে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরু হয় তখন আমিও সে আন্দোলনে যোগ দেই। আমি কুমিল্লায় যত কোটাবিরোধী আন্দোলন হয়েছে সব গুলাতেই থাকার চেষ্টা করেছি।গত ১৮ জুলাই কুমিল্লার কোটবাড়িতে প্রথম আমি আক্রমণের শিকার হই। তবে সেদিন গুরুতর তেমন আঘাত শরীরে লাগেনি। তারপর গত ২ আগস্ট কোটা আন্দোলনের কর্মসূচি ছিলো কুমিল্লা পুলিশ লাইনে।সেখানে আমি শুরু থেকেই ছিলাম।পরের দিন আবারো একই জায়গায় কর্মসূচি ছিলো আমাদের। তবে সেদিন আওয়ামীলীগ ও পুলিশ আমাদের কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করার জন্য টিয়ারগ্যাস ও রাবার বুলেট ছুঁড়ে। সেদিন কোন রকম আমি সহ আমার ৪/৫ জন বন্ধু দৌঁড়ে একটা বাসায় গিয়ে জীবন রক্ষা করি। একটা আঙ্কেল আমাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন ওনার বাসায়।
আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য আমি আমার নিজ গ্রামের বাড়িও যেতাম না। কারন বাড়ি গেলে মা বাবা কুমিল্লা আসতে দিবে না।
৪ আগষ্ট আমাদের পরবর্তী কর্মসূচি ছিলো কোটবাড়ি এলাকায়। আমি সহ আমার কিছু বন্ধু আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য কোটবাড়ি যাই।আনুমানিক বিকাল ৪ টায় আমাদের আন্দোলন চলা অবস্থায় হঠাৎ করে ছাত্রলীগের কিছু কর্মী আমাদের সবার উপর লাঠি ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ চালায়। আমি তখন নামাজ পড়তে পাশের একটা মসজিদে অজু করছিলাম। আমার বন্ধুরা যে যেভাবে পেরেছে দৌঁড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। আমি মসজিদে থাকার কারনে আমি যেতে পারিনি। তখন আমাকে ৬/৭ জন ছাত্রলীগ কর্মী অজুখানা থেকে বের করে চারিদিক থেকে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। তারা মারতে মারতে আমার ডান হাতের হাঁড় ও পায়ের হাঁড় ভেঙ্গে ফেলে। আমার নাকে ও মাথায় চাপাতি দিয়ে আঘাত করে। আমি কোন রকম ভাবে দৌঁড়ে একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে যাই।সেখানে গিয়ে আর কি হয়েছে আমার কিছু মনে নেই। পরে জানতে পারি আমার মাথায় ১০ সেলাই আর নাকে ৩ সেলাই লেগেছে। হাতের হাঁড় ভাঙ্গাতে অপারেশন করে ২টা প্লেট বসাতে হইছে,আর পায়ে স্ক্রু বসাতে হইছে।এই সকল অপারেশন করাতে আমাদের প্রায় আড়াই লাখ টাকার উপরে খরচ হয়েছে। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে এত টাকা চিকিৎসা খরচ চালাতে হিমসিম খেয়েছে আমার পরিবার।আমার কিছু বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়-স্বজন আর্থিক কিছু সহযোগিতা করেছে তখন।আর আমাদের যা জমানো টাকা ছিলো সব আমার চিকিৎসার জন্য ব্যয় করা হয়েছে।আমার চিকিৎসা কিন্তু এখনো চলমান।হাতের সেলাই টা কিছুদিন পর পর ইনফেকশন হয়। ডাক্তারের কাছে গেলে ওনারা ড্রেসিং করে দেয়। এখন আবার কিছু মাস পড়ে অপারেশন করে স্ক্রু ও প্লেট গুলা বের করতে হবে। সেখানেও অনেক বড় অংকের টাকা লাগবে।
আমার স্বপ্ন ভেঙ্গেছে হয়তো,কিন্তু আমি ভাঙ্গিনি। আমি আশা করি আমি আবার আগের মত চলাফেরা করতে পারবো। দেশের স্বার্থে আমি আবার যেকোন কাজে এগিয়ে আসতে পারবো।
ঐ গ্রামের রিফাত হোসেন বলেন, মাহিন আমার সম্পর্কে ভাতিজা হয়,ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে সে গুরুতর জখম হয়। সে অনেক মেধাবী ছাত্র। আমি যতটুকু জানি তাদের পরিবারে সবাই শিক্ষিত। মাহিন উচ্চশিক্ষার জন্য চায়না যাওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যেই এই ঘটনা।
প্রতিবেশী আব্দুল লতিফ বলেন, মাহিন মেধাবী ও নর্মভদ্র ছেলে।ছাত্র আন্দোলনে যাওয়াতে তাকে বেধড়ক মার খেতে হয়েছে। কয়েকদিন আগে হসপিটাল থেকে বাড়ি আসলো। আল্লাহ তারে দ্রুত সুস্থ করে দিক।
মাহিনের বাবা আবু তাহের বলেন, দেশের জন্য কাজ করতে গিয়ে আমার ছেলের জীবন দিতে বসেছে। ছেলেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বাহিরে পাঠাবো।এই জন্য কিছু জমানো টাকা ছিলো। সেগুলা দিয়ে এখন ছেলের চিকিৎসা করেছি। ছেলের আরো চিকিৎসা প্রয়োজন কিন্তু আমরা এত ধনী নই। সরকারের কাছে আবেদন আমাদের আর্থিক সহায়তা করুন আর আমার ছেলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।
এই বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নু এমং মারমা মং বলেন, গত ৫ আগষ্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে বরুড়া উপজেলা থেকে ৯ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে একজন হচ্ছে মাহিন নীরব। আমরা বিষয়টি অবগত ছিলাম। ওনার জখম টা বেশি ছিলো। আমাদের উপজেলা প্রশাসন ওনার পাশে আছে।
